বিদেশে পড়াশোনায় মেলে যেসব সুবিধা

0 190

একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে যাও’। এর সারকথা হচ্ছে শিক্ষা ও জ্ঞানের জন্য নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে আটকে থেকো না। দরকার হলে জ্ঞানের জন্য বিশ্বের সর্বত্র বেরিয়ে পড়ো। পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়াটাও প্রচলিত এ কথার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বটে। বিশেষ করে জীবনের লক্ষ্য ও চাওয়া যদি হয় বিশাল তাহলে তো কোনো কথা-ই নেয়। বিদেশে পড়াশোনা করে যে শুধু বিশ্বমানের ডিগ্রি মিলে তা নয়, এতে একজন শিক্ষার্থী নিজের জীবন ও বিশ্বকে নতুন আঙ্গিকে দেখার সুযোগ পায় যা তাদের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার ও সুন্দর জীবন গড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।

প্রথমত বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের আসল ও প্রধান উদ্দেশ্য কী থাকে? বিশ্বমানের ডিগ্রি অর্জন ও শিক্ষা লাভ। এরপর? পড়াশোনা শেষে অর্জিত ডিগ্রি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশেই চাকরি প্রাপ্তি বা ক্যারিয়ার গড়ার বাসনা। তারপর? চাকরির মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন ও স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছা। বিদেশে পড়াশোনায় কী শুধু এসবই মেলে? না। একদমই না। বিদেশে সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবেশে নতুন একটি ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর থেকেই একজন শিক্ষার্থীর নানান অভিজ্ঞতা অর্জন ও নানান কিছু শেখা শুরু হয়।

বহু সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞানার্জন : উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিশ্বের নানা প্রান্তের নানা ভাষা ও সংস্কৃতির ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে আসে। অর্থাৎ বিদেশের ক্যাম্পাসগুলোয় নানান ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থীদের সম্মিলন ঘটে। এ ধরনের পরিবেশে পড়াশোনা ও অবস্থান করে একজন শিক্ষার্থী প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের নানান সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে জানা বা এক ধরনের ধারণা তৈরির সুযোগ পায়। বিদেশি ক্যাম্পাসগুলো এককথায় বহুসংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞানলাভের বড় উৎস। আর এ জ্ঞান শিক্ষার্থীদের তাদের নিজ দেশে তো বটেই এমনকি পুরো বিশ্বে ক্যারিয়ার গড়ার পথ সুগম করে দেয়।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শেখা : বিদেশের মাটিতে একজন শিক্ষার্থীকে সর্বক্ষেত্রে নতুন পরিবেশ, নতুন পরিস্থিতি এবং নতুন সংস্কৃতির লোকজনের মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে জীবনযাপনের প্রতিটি মুহূর্তই হয় চ্যালেঞ্জের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার পন্থা ও কৌশল শিখে ফেলে বা তাদের শেখা হয়ে যায়। চ্যালেঞ্জগুলো একা একা মোকাবিলা করার সামর্থ্য প্রকারান্তরে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। আর এ আত্মবিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা তাদেরকে ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনে আরও বড় বড় চ্যালেঞ্জ, সমস্যা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলার করার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।

বৈশ্বিক জ্ঞানার্জন : শিক্ষা কখনোই কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা গণ্ডি বা শ্রেণিকক্ষের মতো ক্ষুদ্র স্থানে আবদ্ধ থাকার ব্যাপার না। মানুষ তার প্রাত্যহিক জীবনধারা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেই জীবনের জন্য অতি জরুরি জিনিসগুলো শিখে থাকে। বিশেষ করে কেউ যখন বিদেশে পড়াশোনা করতে যায় তখন তাদের জন্য পুরো বিশ্ব সম্পর্কে জানা ও বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। সেইসঙ্গে অর্জিত হয় জীবন ও জীবনযাপন সম্পর্কে এক্সক্লুসিভ অভিজ্ঞতা।

পছন্দের বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা : উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় সকল বিষয়ে গবেষণার জন্য আছে অবকাঠামোসহ সব ধরনের রিসোর্সের সমাহার। এতে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার সুযোগ পায়। গবেষণা প্রায়োগিক ও তাত্তি¡ক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শিক্ষার্থীরা এ থেকে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কর্মজীবনে প্রতিফলন ঘটাতে পারে। এতে করে ক্যারিয়ারে দ্রুত অগ্রগতি আনতে সক্ষম হয় শিক্ষার্থী ও প্রফেশনালরা।

বিশ্বব্যাপী চাকরির সুযোগ : বিদেশে পড়াশোনার আরেকটা বড় সুবিধা হলো পুরো বিশ্বের চাকরির বাজারে প্রবেশের সুযোগ। উন্নত কোনো দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার নামী বা মধ্যমসারির কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা শুধু নিজ দেশ নয়, সারা বিশ্বেই রয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে বহু সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগে নানান সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে জানার সুযোগ হয়। সেইসঙ্গে ভাষাগত ইস্যু বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার সমস্যাটাও শিক্ষার্থীরা সময়ের সাথে সাথে বেশ সফলভাবেই কাটিয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, একটা সময় পরে ইংরেজি কথোপকতন ও লেখায় সাবলীল হয়ে ওঠে তারা। আর এই বিষয়টিই সফলভাবে ডিগ্রি সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদেরকে বিশ্বের চাকরির বাজারের প্রবেশের সম্ভাবনা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

উজ্জ্বল ক্যারিয়ার, উন্নত জীবনের সুযোগ : বিদেশে পড়াশোনার বড় লাভ হলো বিশ্বমানের ও সময়োপযোগী ডিগ্রি, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন। এ ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজ দেশতো বটেই, সংশ্লিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্রেই চাকরি লাভের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকে। পড়াশোনা শেষ করে যদি সংশ্লিষ্ট দেশেই চাকরি মেলে তাহলে সেখানে ভবিষ্যৎ জীবন গড়ারও সুযোগ তৈরি হয়। এ শুধু ফাঁকা বুলিই নয় কারণ এখন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ ইউরোপের আরও অনেক দেশেই পড়াশোনা শেষে রয়েছে স্থায়ী বসবাসের যথেষ্ট সুযোগ।

সবশেষে, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা বিষয়ক গত ১৬ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের একটা অংশ সংযোজনের মধ্য দিয়ে শেষ করতে চাই। দেশটির পররাষ্ট্র দফতরের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক ব্যুরো এবং ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন আইআইই’র তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১০ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিতে গেছে। দেশটিতে শিক্ষার্থী পাঠানোর দিক দিয়ে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে চীন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৭২ হাজারের বেশি। টানা গত ১৬ বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসা চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়তে যাওয়া চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধির অর্থ কী এই যে চীনে ভালো মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই? না, মোটেই না। আসলে বিশ্বমানের শিক্ষা ও ডিগ্রি লাভ, বিশ্বের নানান সংস্কৃতি ও মানুষ সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে জানা ও বোঝার তাড়া ও চাহিদা থেকেই চীনারা বিশ্বের সব প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে অর্জিত ডিগ্রি, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান প্রকৃতপক্ষে দেশ-বিদেশে চীনাদের ক্যারিয়ার ও জীবন গড়ার রাস্তাকেই সহজ করে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে অবশ্য এটাও বলা হয়েছে যে, উল্লিখিত শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড ৮ হাজার আটশ’র বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য গেছে। তাই কোথায় পড়ব, কী পড়বো, কেন পড়বো—বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সময় এখনই।

Leave A Reply

Your email address will not be published.